নাভির নিচে আগুন

·

Published 10/12/2026
12views

কাকিমার শাড়ি সবসময় একটু উঁচুতে বাঁধা থাকত, নাভির ঠিক নিচে। আমি সেটা প্রথম দেখি পনেরো বছর বয়সে, এক গরম দুপুরে, যখন সে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ডাল ঘুটছিল আর তার পিঠ বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল। ঘরভর্তি গন্ধ। মেথি ফোড়নের, আর তার শরীরের। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, হাতের মুঠোয় একটা ফাটা ক্রিকেট বল। কিছু বলার ছিল না। তবু দাঁড়িয়ে ছিলাম।

"কী চাইস?" সে পিছনে না তাকিয়েই বলল।

"কিছু না।"

"তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

ভালো প্রশ্ন। আমার জানা ছিল না।

সেই থেকে আমি জানি না কেন অনেক কিছু করি। কাকিমা জানে। সে সবসময় জানে। মাঝখানে বারো বছর গেছে, আমি এখন সাতাশ, সে চল্লিশের কাছাকাছি, আর সেই দুপুরের গন্ধটা আমার মাথার ভেতরে এমনভাবে বসে আছে যে কোনো কিছুতে আর নড়ে না। বিয়ে হয়নি আমার। হয়নি বললে ভুল হবে, করিনি। মা জিজ্ঞেস করে প্রতি রবিবার ফোনে, আর আমি প্রতি রবিবার একই উত্তর দিই, "দেখছি।" মা জানে আমি দেখছি না। কাকিমা জানে কেন দেখছি না।

কাকিমার নাম রেবা। রেবা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার কাকার বউ। কাকা থাকতেন না বাড়িতে, চাকরি ছিল দিল্লিতে, বছর দুয়েকের মধ্যে একবার আসতেন, সেই আসাও ছিল নামমাত্র। কাকিমা একা থাকতেন এই তিনতলার ফ্ল্যাটে, আর আমি থাকতাম নিচতলায় মায়ের সাথে। বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। পরিবার বলতে এইটুকুই।

আজ সকালে মা বলল, "কাকিমার সাথে দেখা করে আয়। ওর জ্বর হয়েছে।"

"আপনি দেখে আসেন না কেন?"

"আমার হাঁটু ব্যথা করছে।"

মায়ের হাঁটু কখনও ব্যথা করে না। কিন্তু আমি কিছু বললাম না। উঠে পড়লাম।

সিঁড়ি ভাঙা। প্রতিটা ধাপে একটা করে চিৎকার। আমি চেনা চিৎকার। তিনতলায় পৌঁছে দরজায় টোকা দিলাম। ভেতরে পায়ের শব্দ। তারপর দরজা খুলল।

কাকিমা।

সাদা শাড়ি পরা, চুল খোলা, চোখে ঘুমের দাগ। জ্বরের মুখে একটা লালচে আভা। নাভিটা দেখা যাচ্ছিল, একটু নিচে, শাড়ির ভাঁজ ঠিক যেখানে শেষ হয়েছে।

"ঢুক।"

আমি ঢুকলাম।

ঘরটা ছোট কিন্তু পরিষ্কার। রান্নাঘরের দিক থেকে গন্ধ আসছিল, চায়ের। জানালার পাশে একটা চেয়ার, সেখানে বসে ছিল একটা বিড়াল। কালো। আমি জানতাম না কাকিমার বিড়াল আছে।

"বিড়াল কবে থেকে?"

"তিন মাস। নাম জয়া।"

জয়া আমার দিকে তাকাল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। বিড়ালের রুচি ভালো।

কাকিমা বিছানায় বসল, বালিশটা পিঠের পিছনে ঠেলে দিল। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম।

"বস।"

"দাঁড়িয়ে থাকি।"

"বস।"

বসলাম। চেয়ারে। বিছানার পাশে।

"মা বলল আপনার জ্বর।"

"হ্যাঁ। কাল রাতে এসেছে।"

"ঔষধ খেয়েছেন?"

"খেয়েছি।"

"খাবার?"

"খাইনি।"

"কিছু খেতে হবে।"

"তুই রান্না করবি?"

সে হাসল। আমি হাসলাম। তারপর সে উঠে রান্নাঘরে গেল। আমি বললাম, "আপনি শুয়ে থাকুন, আমি করে নিচ্ছি।"

"তুই পারবি?"

"ভাত রান্না করতে জানি। ডিম পোচ করতে জানি।"

"ডিম পোচ।"

সে আবার বিছানায় বসল। আমি রান্নাঘরে গেলাম।

রান্নাঘরটা ছোট, কিন্তু গোছানো। মশলার কৌটাগুলো সারি সারি, লেবেল লাগানো। কাকিমার কাজ। সবকিছুতে একটা শৃঙ্খলা। তার শাড়িতেও। শুধু নাভির জায়গাটা ছাড়া।

ডিম ভাঙলাম। তেল গরম হল। পেঁয়াজ কাটলাম। পেঁয়াজ কাটতে কাটতে ভাবছিলাম, এই ঘরে আমি কতবার এসেছি। গুনতে পারলাম না। অনেকবার। কতবার এসেছি আর কতবার এই রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অকারণে কিছু একটা নাড়াচাড়া করেছি, সেটাও গুনতে পারলাম না।

"ডালটা উনুনে উঠিয়ে দিস।"

কাকিমার গলা পিছন থেকে। আমি চমকে গেলাম। সে দরজায় দাঁড়িয়ে।

"আপনি শুয়ে থাকতে বললাম।"

"শুয়ে থাকলে ঘুম আসে না।"

সে ভেতরে ঢুকল। রান্নাঘর ছোট, দু'জন মানুষ দাঁড়ালে লাগে। তার কাঁধ আমার বুকে ঠেকল। সে সরে দাঁড়াল না। আমি সরলাম না।

উনুনের আঁচে তার মুখটা লাল দেখাচ্ছিল। জ্বরের লাল না, অন্য লাল। আমি জানি এই লাল। আমি চিনি।

"চা খাবি?"

"আপনি জ্বরে, আপনি চা বানাবেন?"

"চা বানাতে জ্বর লাগে না।"

সে চা বানাল। আমি ডিম পোচ করলাম। দু'জনেই চুপ। শুধু তেলের শব্দ, চায়ের কেটলির শব্দ, আর বাইরে থেকে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসেল। এই বাড়িতে ট্রেনের শব্দ সবসময় থাকে। রাত দুটোতেও। আমি ঘুম ভেঙে গেলে ট্রেনের শব্দ শুনি, আর ভাবি কাকিমার ঘরে ট্রেনের শব্দ কেমন লাগে।

খাওয়ার টেবিলে বসলাম। সে সামনে বসে। প্লেটে ডিম পোচ। তার হাতের আঙুলগুলো সরু, নখ কাটা। সে কাঁটা দিয়ে ডিম কাটল, একটা টুকরো তুলে মুখে দিল।

"ভালো হয়েছে।"

"মশলা কম দিয়েছি, আপনার জ্বর।"

"জ্বরের মধ্যে মশলা কম দিলি, তুই আমার কতটা খেয়াল রাখিস।"

এই কথাটা সে বলল হাসতে হাসতে। কিন্তু চোখে হাসি ছিল না।

আমি মাথা নিচু করলাম। ভাতের দিকে তাকালাম।

"কাকা কবে আসছেন?"

প্রশ্নটা করলাম কেন জানি না।

"আসছেন না।"

"কেন?"

"আসতে চান না।"

"মানে?"

"মানে আলাদা থাকতে চান।"

সে আরও একটা টুকরো মুখে দিল। শান্ত। যেন আবহাওয়ার খবর দিচ্ছে।

"কবে থেকে?"

"এক বছর।"

"আপনি কাউকে বলেননি?"

"কী বলব? তোমার মাকে? মা শুনলে সারা পাড়া শুনবে।"

সে ঠিক কথা বলেছে। মা জানে মানে রেডিও স্টেশন খুলে গেছে।

"তাহলে আপনি একা থাকেন।"

"তুই আছিস।"

সে আমার দিকে তাকাল। সরাসরি। আমি তাকালাম না। পারলাম না।

খাওয়া শেষ হল। আমি প্লেট ধুতে গেলাম। সে বলল, "থাক। আমি ধুয়ে নেব।"

"আপনি জ্বরে।"

"জ্বর এখন কম।"

সে প্লেট নিতে এগিয়ে এল, আর তার আঙুল আমার আঙুলে ঠেকল। দুই সেকেন্ড। তিন। আমি জানি কত। আমি গুনেছি।

"আমি যাই।"

"যাস?"

"মা অপেক্ষা করছে।"

"আচ্ছা।"

সে দরজা পর্যন্ত এল। আমি বেরোনোর আগে সে বলল, "কাল আবার আসবি?"

"কেন?"

"জয়া তোমাকে পছন্দ করেছে।"

জয়া বিছানায় শুয়ে ছিল, চোখ বন্ধ। বিড়াল কিছু পছন্দ করেনি। কিন্তু আমি মাথা নাড়লাম।

"আসব।"

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পা কাঁপছিল। প্রথম ধাপে ভাবলাম, এটা কী হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে ভাবলাম, এটা অনেকদিন ধরে হচ্ছে। তৃতীয় ধাপে ভাবলাম, কাকিমা জানে।

নিচতলায় ঢুকে দেখি মা টিভি দেখছে। "কাকিমার কী অবস্থা?"

"ভালো।"

"খাবার দিয়েছিস?"

"দিয়েছি।"

"বেশ।"

মা আবার টিভির দিকে তাকাল। আমি আমার ঘরে ঢুকলাম। দরজা বন্ধ করলাম। বিছানায় শুয়ে সিলিং দেখলাম।

সিলিংয়ে একটা ফ্যান। ফ্যান ঘুরছে। আমি ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, কাল আবার যাব। কেন যাব? জ্বর তো কমে যাবে। কিন্তু আমি যাব।

আমি জানি আমি যাব।

আর কাকিমা জানে আমি যাব।

এই জানাটাই সমস্যা। এই জানাটাই সেই দুপুরের গন্ধ, যেটা বারো বছর ধরে আমার মাথার ভেতরে বসে আছে, নড়ে না, যায় না, শুধু থাকে।

রাতে ঘুম আসল না। উঠে জানালার কাছে গেলাম। তিনতলার দিকে তাকালাম। কাকিমার ঘরের আলো জ্বলছে। এখন রাত একটা। সে ঘুমায়নি।

আমি জানালায় দাঁড়িয়ে রইলাম। মশারির ভেতরে বন্দী মশার মতো।

আলো নিভে গেল।

তারপর আবার জ্বলল।

আমি হাসলাম। নিজের অজান্তে। তারপর বিছানায় ফিরে গেলাম। চোখ বন্ধ করলাম। ঘুম এল না, কিন্তু স্বপ্ন এল। স্বপ্নে কাকিমা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে, শাড়ি উঁচুতে বাঁধা, আর সে বলছে, "তুই কেন আসিস?"

আমি বলছি, "জানি না।"

সে বলছে, "আমি জানি।"

জেগে উঠলাম। বুক ধড়ফড়। বাইরে তখন ভোরের আলো। ট্রেনের শব্দ। মায়ের কাশির শব্দ।

আমি উঠে বসলাম। কাল আবার যাব। এই ভাবনাটা আজ আরও ভারী। কারণ এখন আমি জানি সে জানে। আর সে জানে যে আমি জানি যে সে জানে। এই জানাজানি খেলা নয়। এটা অন্য কিছু। এই কিছুটার কোনো নাম আমি জানি না। কিন্তু কাকিমা জানে।



12views

Watch this moment

Turn the current scene into a cinematic Live Chapter — what you watch becomes the story's next part.

Comments

Sign in to join the conversation.

No comments yet. Be the first to share your thoughts.

Disclaimer

This is a work of fiction, assisted by artificial intelligence. Any names or characters, businesses or places, events or incidents, are fictitious. Any resemblance to actual persons, living or dead, or actual events is purely coincidental.

Content Removal Policy

  • Users may report content that may be illegal or violates our Standards.
  • All reported complaints will be reviewed and resolved within seven business days.
  • Review Process: Our team will assess the reported content against our guidelines.
  • Appeals: If you disagree with a decision, you may appeal within 14 days of notification.
  • Potential outcomes include: content removal, account warning, or no action if no violation is found.

To report content, email us at [email protected]